২২ জুলাই ২০২৩। দ্বিতীয় পর্ব। দ্বিতীয় দিন।
ব্যান্ডেল চার্চ থেকে আমাদের যাত্রা একটা বোট কে সুন্দরবনে নিয়ে যাবার ঘটনার বিবরণ । আজ দ্বিতীয় দিনের যাত্রার কথা। প্রথম দিনে কি কি হয়েছে তার লেখা লিংক কমেন্টস এ দিলাম ।
সকালে প্রায় ৪:৩০ মিনিটে ঘুম ভাঙলো ইঞ্জিনের আওয়াজে। জেটি তে দাঁড়িয়ে পরান মাঝি । প্রায় ৮ বছর এই বোটের সাথে যুক্ত সে। তার বাড়ি , ঘর , আনন্দ , দুঃখ সবই এই বোটে। আজ এই বোট সে আর উঠবে না, যাবে না আর। তার মালিক / কর্তার নির্দেশ তাকে মালিকের বাড়ি যেতে হবে। বোট টা আর তার নয়। গত রাতে গণেশ, দিনু দা আর লালু দা কে বোটের আটঘাট সব ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছিল। আজ তার ৮ বছরের বাসস্থান ছাড়তে হচ্ছে । আমরা সবাই অনেক করে অনুরোধ করলাম আমাদের সাথে আসতে। সে অপারগ, কাজ এখন ছাড়তে পারবে না। কিছু দিন পরে স্থলপথে বাড়ি যাবে জানালো।
পরান কাকার মনের ভাব আমাদের মনকেও ভারাক্লান্ত করল। বোট ছাড়লো – জেটি থেকে দড়ি খুলে, জেটি তে দাঁড়িয়ে রইলো পরান মাঝি – আমরা ৫ জন ভেসে চললাম নুতন ঊষায়। যতদূর থেকে দেখা গেলো রানী রাসমণির ঘাট , জেটিতে পরান কাকা দাঁড়িয়ে দেখছে তার ঘর, বাসা চলে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে।
সকালের আলো ফোঁটার সাথে সাথে আমরাও এগিয়ে চললাম কলকাতার দিকে। কত পুরানো ফ্যাক্টরি, জুট মিল নদীর ডান দিক, বাম দিকে দিয়ে বয়ে চলেছে , আবার দেখা যাচ্ছে অনেক নতুন নতুন হাউসিং কমপ্লেক্স , residential society. যেতে যেতে বাম পাশে এলো দক্ষিনেশ্বর মন্দির। সূর্য উঠলো মন্দিরের মাথার উপরে থেকে । চলতে চলতে পেরিয়ে গেলাম বিবেকানন্দ সেতু (বালি ব্রিজ ), নিবেদিতা সেতু । ডান হাতে ধীরে ধীরে দেখা গেল বেলুড় মঠের মন্দির। তার সাথে আমার বিশেষ ভালোলাগার স্বামীজীর ঘর টি। দূর থেকে প্রণাম সেরে নিলাম।
এতো গেল নদীর পারের কথা – নদীর ওপরে কিন্তু বেশ ভীড়। ছোট ছোট নৌকা মাছ ধরছে জাল বিছিয়ে । জাল বুঝে তার থেকে পাশ কাটিয়ে বোট কে বের করে নিয়ে যাওয়া পাইলট – গনেশ এর চ্যালেঞ্জ। গনেশ বোট চালায় সুন্দরবনে। সেই সব নদীতে এই রকম মাছ ধারার মাছুড়ে জাল বিছিয়ে নদীতে বসে থাকে না. তাই এই ব্যবস্থা টা গনেশ , দিনু দা আর লালু দার এর কাছে একদম নতুন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছোট নৌকায় বসা মাঝির কাছে মুখ ও শুনতে হল আমাদের ।
যাক এইসবের মধ্যে মাঝে চা আর প্রাতরাশ এ মুড়ি আর আগের সন্ধেয় কিনে রাখা বোঁদে সকালের জলখাবার টা বেশ হলো।
আমি ব্যস্ত – দুই চোখ মেলে হুগলী নদীর রূপ দেখতে আর ছবি তুলছি । দেখতে দেখতে কলকাতার legendary landmark হাওড়া ব্রিজ এসে গেল চোখের সামনে । আমাদের New Usha থেকে তার বিশালাকার মূর্তি সকালের আলো তে – সে এক অপরিসীম দৃশ্য।










বোট না থেমে এগিয়ে চলেছে, ডান দিকে চলে গেল হাওড়া স্টেশন, বাম দিকে নিউ সেক্রিয়াট বাড়ি, ইডেন গার্ডেন, স্টেডিয়াম, প্রিন্সেপ ঘাট। মাথার ওপর দিয়ে এবার চলে গেল বিদ্যাসাগর সেতু। জলের ওপরে শুরু হলো বিশাল বিশাল নোঙ্গর করা জাহাজের উপস্থিতি। অনতি দূরে খিদিরপুর ডক। ডান দিকে পৃথিবী বিখ্যাত botanical garden এর সেই চারশো বছরের বেশি পুরনো বট গাছ. বাম দিকে চলে এলো Garden Reach Ship Builders , দূর থেকে দেখা যাচ্ছে “NO PHOTOGRAPHY ” লেখা বিরাট পোস্টার ।
খিদিরপুরের পর থেকে গনেশের জন্য আর একটা চ্যালেঞ্জ এল। আমাদের জানা আছে হুগলী নদীর নব্যতা বেশি না। তার মধ্যে ভাটা শুরু হওয়ায় গনেশ একটু চাপে পরে গেল , বোট নদীর কোন দিক দিয়ে নিয়ে যাবে – এই ভেবে। আমার বাড়ি বাটানগর হবার সুবাদে আমি ছোটোবেলা থেকে অনেকটা সময় এই নদীর পাশে কাটিয়েছি। অনেক বড় বড় জাহাজ দেখেছি এই নদী দিয়ে যেতে । হুগলী নদীর নব্যতা অনুযায়ী পোর্ট কর্তৃপক্ষের এর তরফে নদীর ভিতরে একটা রাস্তা করা আছে জানতাম । নদীর ওপরে বড় বড় ভাসমান বয়া আছে। দেখেছিলাম, জাহাজ গুলি সেই বয়া কে বাম পাশে রেখে নদীর ডান দিক ঘেঁষে চলে দক্ষিণ দিকে । সেই প্রযবেক্ষণ কে কাজে লাগিয়ে , গনেশ কে ওই বয়া গুলি ধরে ধরে চলতে বললাম । উপকার পেলাম , ভাঁটার টানে আমাদের বোট বেশ গতি নিয়ে দক্ষিণের দিকে তাড়াতাড়ি বয়ে চললো। এই ভাবে প্রায় সকাল ১১ পেড়িয়ে গেলাম বাটানগর , বজ বজ , চাড়িয়াল , আছিপুর আর বিড়লাপুর। ধীরে ধীরে বোট এসে পড়লো গাদিয়ারা , নূরপুরে।
জুলাই মাসের সূর্য আলোয় স্নান করা একটা সকাল । নদীর দুই দিকে, আস্তে আস্তে দৃশ্য পরিবর্তন হয়ে গেছে , গ্রাম্য মফঃস্বলের ছোয়া, সদ্য বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া গাছ পালা, আর একটু পরে পরে ইট খোলার চিমনি । বেশ কিছু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা পুরানো জুট মিল , তাদের বিশাল বিশাল ফ্যাক্টরির ছাউনি এখন বট ও অশত্থ গাছে ঢাকা পড়ে ভগ্নাবশেষ – হুগলি নদীর দুই পার কে আরও বেশি করে বাংলার গর্বের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়।
চলে আসি আমাদের যাত্রার বিত্তান্ত নিয়ে , ডান দিকে গাদিয়ারা , আর বামে নূরপুর এলে হুগলী নদী এসে রূপনারায়ণ নদীর সাথে মিশে চলে আরও দক্ষিণ মুখী । এইখান থেকে হুগলী নদী আরো চওড়া হয়। এই বাঁকে এসে আমরা জলে ভাসা বয়ার লাইন টা হারিয়ে ফেললাম । বয়া দেখা যাচ্ছে , কিন্তু সে তো নদীর একদম ডান পাড়ে। সেই প্রযন্ত কি করে পৌঁছাব , সেটাই চিন্তার । ভাঁটায় জল অনেকটা নেবে গেছে। এই রকম জায়গাতে বোট যদি কোন চড়ায় আটকায় তাহলে বোট কাত হয়ে উল্টে যাবার সম্ভাবনা থাকে ।
হুগলি নদীর এইখান থেকে আবার শুরু হলো মাছ ধরার নৌকার আনাগোনা । জুলাই মাসের জোয়ারের অপেক্ষা বড় বড় জাল জলে নাবিয়ে মাছুড়ে মাঝিরা বসে আছে নৌকায় , হ্যাঁ এইখানে উঠে রূপনারায়ণের বিখ্যাত কোলাঘাটের ইলিশ । গনেশ ভাই কে একটু চিন্তিত দেখলাম , একই নদীর নিচে চড়ার ভয় আর তার ওপরে মাছ ধরার নৌকো আর তাদের জাল। সাহায্য এস গেল একটু সময় পরে , চলার পথে একটা মাছ ধরার নৌকা যাচ্ছিল আমাদের ঠিক পাশে, তাকে নদীর ভিতরের রাস্তা জিজ্ঞেস করতে পথ বলে দিল। জিজ্ঞেস করলাম সে কোথায় যাবে? সেও চলেছে ডায়মন্ড হারবার এর দিকে । তার নৌকা টিকে আমাদের বোটে বেঁধে নিয়ে মাঝি কে নিলাম আমাদের বোটে , কিচ্ছুক্ষনের জন্য মাঝি হলো আমাদের বোটের পাইলট । আমরা নিশ্চিন্তে ডায়মন্ড হারবার এর পথে ভেসে চললাম ।
ইতি মধ্যে বেলা বেড়েছে , তার সাথে জোয়ার ও এসে গেল। নদীর জলের গতিপথ হলো আমাদের যাত্রার উল্টোমুখী । আমাদের গতি কমলো। গনেশ আর লালু দা ঠিক করল, স্রোতের উল্টো দিকে না বেয়ে বোটের ইঞ্জিন টা কে একটু বিশ্রাম দেওয়া হোকে। প্রায় দুপুরটা ১ টা নাগাদ বোট এসে লাগলো ডায়মন্ড হারবারের ফেরি ঘাটে। দুপুর রান্নার দিনু দা আর লালু দা আগেই শুরু করে দিয়েছিলো । প্রায় দেড়টা নাগাদ নদীর জলে স্নান সেড়ে খাওয়া হলো বেশ। একটা সমস্যা হচ্ছিল আমাদের। মোবাইল এর ব্যাটারী শেষ হচ্ছিল খুব তাড়াতাড়ি। ডায়মন্ড এর বাজারে গেলাম। কিছু যদি পাই, বোটের ইঞ্জিন – ডায়নামো থেকে যে কারেন্ট হচ্ছে তার থেকে যদি মোবাইল চার্জিং এর একটা ব্যবস্থা করা যায়। অনেক খুঁজে সেই রকম কোনো দোকান পেলাম না। ফিরে এলাম চিড়ে ভাজা, বাদাম , আর শুকনো ছোলা হাতে করে। জোয়ারের টানে বড় বড় জাহাজ চলেছে কলকাতার দিকে , দেখতে বেশ ভালো লাগে, আর তার সাথে নদীর জলের দুলুনি। ঠিক হলো সবাই একটু বিশ্রাম নিয়ে বোট ছাড়বে আড়াইটে সময়।
