২২ জুলাই ২০২৩। দ্বিতীয় দিন, তৃতীয় পর্ব , মধ্যাহ্নের পরে .
দুপুর আড়াইটে বোট আবার ছাড়লো , যেতে হবে দক্ষিণ মুখে। আরও দক্ষিণে নামখানা , সেখান থেকে হাতানিয়া – দোয়ানিয়া নদী ধরে সুন্দরবনের পথে। জোয়ারের চাপ টা অনেক কমেছে, ভাঁটা আসার সময় হয়েছে । এইটা আদর্শ সময় বোট ছাড়ার। ভাঁটার টানে দক্ষিণ মুখে বেশ তাড়াতাড়ি যাওয়া যাবে । সকাল থেকে গণেশ ভাই বোট চালিয়ে কান্ত হয়ে, নিচের ডেকে একটু বিশ্রাম করছে, দিনু দা বসেছে পাইলট wheel এ। ডায়মন্ড হারবার থেকে হুগলী নদীর বাম দিকের পাড় ধরে চলার কথা আমাদের বোটের । কিন্তু দিনু দা বোটের মুখ করেছে সেই বয়া গুলি লক্ষ্য করে। বয়া গুলি , এখানে বড় জাহাজের জন্য রাখা আছে যে নদী পথ হলদিয়া হয়ে গঙ্গাসাগর দ্বীপ কে বাম হাতে রেখে বঙ্গোপসাগর এর গিয়ে পড়েছে । আমারও দুপুরের ঘুম লেগেছিল ওপরে ডেকে বসে, তাই লক্ষ্য করিনি এই পথের ভুলটি । প্রায় ৩০ মিনিট পড়ে খেয়াল করলাম বিশাল গঙ্গা নদীর মাঝ বরাবর আমরা এগিয়ে চলেছি হলদিয়ার দিকে । পথ পরিবর্তন করা হলো ভুল বুঝতে পেরে । আবার মাঝ নদী দিয়ে ফিরতে লাগলো বোট , হুগলী নদীর বাম পাড়ের দিকে । যেতে যেতে সামনে পড়লো ঘোড়ামারা দ্বীপ। প্রায় ২ ঘন্টা হয়ে গেছে ডায়মন্ড হারবার ছেড়েছি। নদীর এই অংশে নব্যতা খুব কম, কিন্তু পথ নির্দেশের জন্য অনেক দূরে দূরে ভাসমান বয়া দেখা যাচ্ছে ।
গনেশ ভাই, wheel এ বসে বার বার তার বন্ধু পাইলট আশীষ কে ফোন করছে। বুঝলাম তার গলায় উৎকণ্ঠা , সে যে এই নদী পথ চেনে না। ভয় একটাই , জলের নিচের চড়ে যদি বোট আটকে যায়। আর কিছু টা এগিয়ে হঠাৎ বোটের সামনে দিকে মাটিতে ঘষা খাবার আওয়াজ। লালু দার তৎপরতায় মোটা বাঁশের লগি দিয়ে চেপে বোটের মুখ ঘুরিয়ে দিয়ে কোনো রকমে বাঁচানো গেল বোটের চড়ে আটকে যাওয়া । ঘোড়ামারা দ্বীপ তখন মাত্র ৫০ মিটার দূরে। বোট এগিয়ে চলল ঘোড়ামারা দ্বীপ কে ডান হাতে রেখে ।
ঘোড়ামারা দ্বীপ টি সম্বন্ধে অনেক কিছু জানলাম সমীর দার থেকে। এই দ্বীপ টা খুব বিপদজনক এবং সরকারি ভাবে মানুষের বসবাসের অযোগ্য। অনেক বছর আগে সরকার থেকে এই দ্বীপ টি কে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে । তবু দেখলাম দ্বীপের ভিতরে মানুষের বসবাস। পানের বুরুজ , ছাগল -গরু চড়ে বেড়াচ্ছে , কিছু ধানী জমি ও চোখে পড়লো । মানুষের বসবাস সাময়িক। উর্বর জমির জন্য মানুষজন এই দ্বীপে আছে। কিন্তু দ্বীপে না আছে electric supply, না আছে পিচের রাস্তা, না আছে খাবার জলের সরকারি ব্যবস্থা। একটা প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র ও নাই। এই দ্বীপে সরকারি অনুমোদিত ফেরী বোটের রুট নেই। আসতে হয়ে মাছ ধরার trailer ভাড়া করে, কাকদ্বীপ থেকে। এই সব শুনতে শুনতে দুই চোখ মেলে দেখতে থাকলাম ঘোড়ামারা দ্বীপ। কোন বড় ঝড়ের পূর্বাভাস থাকলে দ্বীপের মানুষজন আগে থেকে দ্বীপ ছেড়ে চলে যায় মূল ভূখণ্ডে । ভূতাত্বিক বিজ্ঞনীদের মতে এই দ্বীপ আর কিছু বছর পরে নদীর সাথে মিলিয়ে যাবে জলের স্রোতে। দেখতে দেখতে ঘোড়ামারা দ্বীপ কে ডান হাতে রেখেছে আমাদের নিউ উষা এগিয়ে চলল, সাগর দ্বীপের দিকে ।
ঘোড়ামারা দ্বীপের ঠিক দক্ষিণে সাগর দ্বীপ অবস্থিত। সাগর দ্বীপ যেমন ঐতিহাসিক ভাবে উল্লেক্ষিত, আধুনিক সময় সাগর দ্বীপ বেশ গুরুত্ব পূর্ন হয়ে উঠেছে । প্রচুর মানুষের বসবাস এই দ্বীপে। গঙ্গাসাগর মেলার জন্য বিখ্যাত হলেও এখন সাগর দ্বীপ – গঙ্গাসাগর একটা পর্যটন বিশেষ আকর্ষণের জায়গা। গঙ্গাসাগরের কথা পরে কখন বিস্তারিত লিখব।
আমাদের বোট চলতে থাকলো দক্ষিণ দিকে মুখ করে। ঘোড়ামারা দ্বীপ ডান হাতে শেষ হতে বোট পড়লো বিশাল ঢেউ এর মধ্যে। বড়ো জাহাজ যেমন Picthcing হয়ে ঠিক সেইরকম pitching হতে লাগলো। বড়ো বড়ো ঢেউ একবারে বোটের সামনে , বোট মাথা একবার ঢেউ এর ওপরে চড়ছে , আর পরের মুহূর্তে ঝপাৎ করে ঢেউ ভেঙে পড়ছে। জলের ছিটা উঠে আসছে বোটের ওপরে ডেকে। আমরা একদম প্রস্তুত ছিলাম না রকম ঢেউ এর জন্য। বুঝলাম আবার ভুল পথে চলে এসেছে আমাদের বোট। Motor vessel হবার সুবিধা তা এই জায়গায় বুঝতে পারলাম। বোটের সামনে ছুচালো হবার জন্য সহজে বড় বড় ঢেউ গুলিকে ভেঙে যেতে পারলো আমাদের MV New Usha . বেশিক্ষণ লাগলো না, এই প্রতিকূল ঢেউ এর থেকে বের হতে। তবুও যে সময় টা ছিলাম – সেই টুকু সময় যথেষ্ট ছিল মনে রাখার জন্য। শান্ত নদীতে পড়ে সবাই একটু স্বস্তি পেলাম ।
এখন বেলা প্রায় চার টা তিরিশ বাজে , আমরা সাগরদ্বীপের ফেরী ঘাটের কচুবেড়িয়া পাশে দিয়ে দক্ষিণ মুখে চলতে লাগলাম। গনেশ বার বার ফোন করছে তার নামখানার বন্ধু কে , কিন্তু সঠিক দিক ধরতে পারছে না। আমি আর সমীর দা বেশি কিছু বললাম না, তারা বোট চালানোয় অনেক বেশি পারদর্শী, অভিঞ্জ। ভরসা রাখলাম ওদের ওপরে। আর উপভোগ করতে লাগলাম নদীর ওপরে ভেসে চলা।
কচুবেড়িয়া ফেরী ঘাট ডান হাতে পিছনে ছেড়ে আমাদের বোট পুব দিকে মোড় নিল। সামনে একটা জন মানবহীন দ্বীপ – পড়ে গুগল ম্যাপ দেখে জেনেছিলাম দ্বীপ টার নাম “Blacky Island ” কোনো মানুষ থাকে না এই দ্বীপে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে বড় গাছের সারী দ্বীপের বালি রেখায় ।
ভাঁটার টান বেশ ভালোই আছে , বোট চলছে বেশ জোড়ে। হঠাৎ একটা ঝটকা লাগলো বোটের নিচে । প্রায় ছিটকে পড়লাম ডেকের ওপরে । Blacky Island এর কাছে বোট ঠেকে গেল চড়াতে। লালু দা দিনু দা অনেক চেষ্টা করল , বাঁশ দিয়ে ঠেলে , engine reverse এ ঘুরিয়ে , চড়া আটকানো বোট কে পিছনে নেবার , কিন্তু ভাঁটার শেষ সময় জল নাবার গতি এত বেশী যে ৫ থেকে ৬ মিনিটের মধ্যে বোটের নিচে মাটি দেখা যেতে লাগলো । বোটের প্রপেরলে মাটিতে ঘষে খাবার আওয়াজ হতে লাগলো । চারটে মোটা বাঁশ ছিল বোটে , সেগুলি দুটি বোটের সামনে আর দুটি বোটের পিছনে মাটির মধ্যে গেঁথে শক্ত করে বোট টিকে বাঁধা হলো। যাতে বোট কাত না হয়ে যায় . এখন একমাত্র উপায়, অপেক্ষা – জোয়ারের জল উঠলে বোট ভাসবে , আমরা আবার এগোতে পারবো । অপেক্ষার সময় প্রায় ৪ ঘন্টা হতে পারে ।
দুর্ভাগ্য আমাদের, ডায়মন্ড হারবার ছাড়ার পরে আমাদের মোবাইল দুটির ব্যাটারী শেষ হয়ে গেছিল, তাই এই রোমাঞ্চকর যাত্রার এই অংশের কোন ছবি আমরা তুলতে পারিনি । ব্যান্ডেল চার্চ থেকে সুন্দরবনে বোট নিয়ে যাবার দ্বিতীয় দিনে এতো ঘটনা যে সারাদিনের কথা মাথায় রাখা মুশকিল । সকালে টিটাগড় থেকে বোট ছেড়ে পড়ন্ত বিকালে বোট এসে ঠেকেছে একটা ঘন কালো রঙের দ্বীপের উত্তরে । সমীর দা আর আমি উপরের ডেকে চৌকির ওপরে বসে আছি . পশ্চিমে ডুবন্ত সূর্যের আলো – দূরে বাম দিকে কাকদ্বীপের Hardwood Point এর আলো , আর ডান দিকে পিছনে ফেলে আসা কচুবেড়িয়ার ঘাট। অপেক্ষায় ধীরে অন্ধকার নেবে এলো। বোটের চৌকি তে চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশের তারা আর মেঘের আনাগোনা দেখতে থাকলাম। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র এর কপালকুণ্ডলায় লেখা নদীর মোহনার সেই রূপ স্বচক্ষে অনুভব করলাম এই সন্ধ্যায়।
রাত প্রায় ৮ টা , বোট একটু দুলে উঠল। সবাই আবার তৎপর হয়ে উঠলো। বাঁশের ঠেঁকা খোলা হলো নদীর চড় থেকে, আবার একটু একটু করে ভাঁসতে থাকলো আমাদের বোট টি। খুব সাবধানে চড় থেকে বেড় করে বোট চললো একদম পূর্ব দিকে মুখ করে। হুগলি নদীর এই অংশ কে বলা হয়ে , “মুড়ি গঙ্গা ” . এই নদীতে বেশি চলে বাংলাদেশ গামী জাহাজ যে গুলি , কলকাতা ও তার পার্শবর্তী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পোঁড়া কয়লার ছাই নিয়ে যায় বাংলাদেশ এ। বেশ কিছু জাহাজ পেলাম সেই রকম , সবাই চলেছে উত্তর মুখী , আমাদের বোট দক্ষিণের পথে। আমাদের এখনকার গন্তব্য নামখানা। প্রায় রাত ১০ টায় পৌঁছে গেলাম , হাতানিয়া – দোয়ানিয়া নদীর মুখে। এইখান থেকে আমাদের বোট হুগলী – গঙ্গা বা মুড়ি গঙ্গা নদী ছেড়ে ঢুকে পড়ল অপেক্ষাকৃত ছোট নদী হাতানিয়া – দোয়ানিয়ায়। নদীর মুখে বাংলাদেশ যাবার (বা আসার ) জাহাজের মেলা । গুনে শেষ করার যাবে না এতো। আর নদীর একটু ভিতরে গভীর সমুদ্র মাছ ধরতে যাবার ট্রেলার এর ভিড়। সেই বিশাল আকারের ট্রেলার গুলি আমাদের New Usha থেকে তিন গুন্ উঁচু , গতিবেগ ও অনেক বেশি । মাঝে মাঝে উলটো দিক থেকে ধেঁয়ে আসা এই বিশাল দৈত্য মত ট্রেলার গুলি বেশ চমকে দেয়। নামখানা জেটি খুব ব্যস্ত এই জুলাই অগাস্ট মাসের সময়। সমুদ্র থেকে বহু ট্রেলার মাছ নিয়ে আসে , নামখানায় ট্রেলার থেকে সেই মাছ গাড়ি করে যায় ডায়মন্ড হারবার, সেখানে মাছের আঁড়াতে নিলাম হয়ে মাছ। তারপর আপনাদের বাজারে পৌঁছে যায় সমুদ্রে থেকে ধরা ইলিশ মাছ।
নামখানা জেটিতে আমাদের বোট লাগাতে হবে, গনেশের বন্ধু, আশীষ, যে সারাদিন আমাদের বোটের চলাচলে সাহায্য করেছে ফোনে, উঠবে বোট এ। আশীষ এই নদী পথে বোট চালায় , সে জানে নদী পথ , আর তার গতিবিধি । ট্রেলার ভিড়ের মধ্যেই কোন রকমে নামখানা জেটি তে বোট লাগিয়ে আশীষ কে তুলে নেওয়া হল বোটে। আশীষ সাথে এনেছে মোবাইল চার্জ করার যন্ত্র , ইঞ্জিনের এর ডায়নামো থেকে আমাদের মোবাইল চার্জ করার জন্য ।
বোটে উঠে আশীষ ধরলো বোটের হাল , সাথে সাথে বোটের সকলের মনে একটা নতুন করে উদ্দম এলো। আশীষ দেখলাম বেশ ভালো নদী চেন। রাতের অন্ধকারে নামখানা থেকে বোট ছেড়ে প্রায় দুই ঘন্টা পথ চলে মাঝ নদীতে নোঙ্গর করলো। রাতের খাবার সময়, খিচুড়ি, ডিম্ ভাজা, আলু ভাজা। রাত প্রায় ১২ টা। বোট রাখা হয়েছে লথিয়ান Island এর উত্তরে। সারা দিনের ক্লান্তিতে ঘুম আসতে বেশিক্ষন লাগলো না। শুয়েছিলাম উপরের ডেকে চৌকিতে। একটু মশার ছিল , রাত প্রায় ২ টো , একসাথে অনেক গুলি শিয়ালের ডাকে হঠাৎ ঘুম ভাঙলো। লথিয়ান দ্বীপের পাড়ে দাঁড়িয়ে ৫ টি শিয়াল আমাদের বোটের দিকে তাকিয়ে সমস্বরে ডাক ছাড়ছে। তারপর শুরু হলো , তুমুল ধারায় বৃষ্টি। আমরা সবাই তাড়াতাড়ি বোটের নিচের ডেক এ ঢুকলাম , বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য । এই ভাবে শেষ হলো একটা পুরো দিনের যাত্রা ।
ক্রমশ ……… , আগামী পর্বে তৃতীয় ওর শেষ দিনের অভিজ্ঞতা থাকবে।
এই পর্বের কোন ছবি নাই , মোবাইল এর ব্যাটারী শেষ হয়ে গেছিল । তাই পরবর্তী কোন সময়ের তোলো একটা গঙ্গাসাগর কচুবেড়িয়ার ঘাটের একটা ছবি দিলাম।
