গত মাসের শেষে দিকে একবার সুন্দরবন যাবার সুযোগ হলো। গেছিলাম কিছু কাজ নিয়ে। Bhim Mndal ভিম দা আর Raju Mandal রাজু সাথে দেখা করা, তাদের নতুন বোট টা কে দেখা, একটু নিজে সুন্দরবন ঘোরা। আমার কাজ টা এই রকম, কোন কাজ না থাকলে একটু ঘুরে বেড়াই, আর কাজ থাকলেও ঘুরে বেড়াই।
কলকাতা থেকে সকাল বেলা মোটরসাইকেল চালিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম, গদখালী এর উদ্দেশ্যে। প্রায় সকাল 10 টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম। মোটরসাইকেল টা গদখালী সাইকেল রাখার গ্যারেজ এ জমা করে, উঠলাম গোসাবা যাবার ফেরী বোট এ। তারপর ইলেক্টিক টোটো করে পাখিরালয় , আর একটা ফেরী বোট করে দয়াপুর পৌঁছাতে হয়ে গেলো 12 টা। রাজু কে বলা ছিল, রাজু দয়াপুর এ মোটরসাইকেল এসে আমাকে নিয়ে গেলো তাদের গ্রামে, রজত জুবিলী গ্রাম।
রজত জুবিলী গ্রাম টা, সুন্দরবনের সাতজেলিয়া দ্বীপের একটা গ্রাম। বিদ্যাধরী নদীর একটা শাখা নদীর পাশে গ্রামটি। নদীর উল্টো দিকে সুন্দরবনের মূল অংশ, যেটা বড় নেট দিয়ে ঘিরে রেখেছে যাতে বাঘ নদী সাঁতরে এই গ্রামে না আসতে পারে। শান্ত গ্রাম, প্রচুর ধানি জমি, প্রতি টা বাড়িতে ছোট পুকুর। গ্রামের বাড়ি আর নদীর মাঝে উচু বাঁধ। নদীতে জল নোনা, তাই নদীর জল গ্রামে এলে ধানী জমি নষ্ট হবার সম্ভবনা। খাবার জলের জন্য দূরে দূরে tubewell আছে, কিন্তু জল অনেক গভীরে। বেশির ভাগ বাড়ি টিনের চালের আর দেওয়াল ইটা বা মাটি দিয়ে গাঁথা।
সুন্দরবনের মানুষ গুলি মন থেকে খুব সরল, আমি কোথায় এসেছি, কেন এসেছি এই সব প্রশ্নের সামনে তো পড়তে হয়ে। পাহাড়ে থাকি শুনে দার্জিলিঙ এ যুদ্ধের পরিস্থিতি কেমন সেই প্রশ্নের সামনে ও পড়তে হল। সুন্দর একটা নদীর পাশে সুন্দর একটা গ্রাম, সুন্দর মানুষদের সাথে , আমার সুন্দরবন।
আমার জায়গা হলো একটা হোটেলের ঘরে। আমি ছাড়া আর কেউ নাই সেই হোটেলে। এমনকি হোটেলের ম্যানেজার, কাজের লোক ও নেই। ঘর খোলা ছিল, আমার জন্য।
মে মাসের প্রচণ্ড গরমের ভিতর, গাছে ঢাকা জলের ট্যাংক এর ঠাণ্ডা জল, স্নান করে খুব শান্তি পেলাম। দুপুরের খাবার ভিম দার বাড়িতে। খাবার পর একটা ছোট্ট ঘুম।
গ্রামের দেশে ঘুমের শান্তি নাই, একটু পর ইলেকট্রিক চলে গেলো, অসহ্য গরমে ঘুম ভেগে গেলো। বুঝলাম, ঘরে বসার থেকে নদীর ধারে বেঁধে রাখা বোটের ডেক অনেক বেশি আরামের। নদীর জলের ওপর দিয়ে বয়ে আসা বাতাস অনেক বেশি আরামের। ক্যামেরা দূরবীন নিয়ে চললাম নদীর দিকে।
ভিম দার নতুন বোট টা বেজায় খাস হয়েছে। প্রায় ৭০ ফুট লম্বা, চওড়ায় প্রায় ২০ ফুট । নিচের ডেক এ ১৮ জন লোকের শোবার ব্যবস্থা। উপরে ডেক এ 3 জনের ব্যবস্থা। ৬ সিলিন্ডার ইঞ্জিন, ৪৫ জন যাত্রী বহনের অনুমতি পেয়েছে সরকারী দপ্তর থেকে। বিকেলটা কাটলো বোট আর নদীর বাঁধ ধরে হেঁটে পাখি দেখে। অনেক চেনা আচেনা পাখি দেখলাম সারা বিকাল।
সন্ধ্যায় ভিম দা বৌমা হাতের চা খেয়ে হোটেলের রুমে ফিরলাম। রাতের খাবার টাও ভিম দার বাড়িতে, বৌদির হাতের রান্না করা পাতলা মুরগির মাংসের ঝোল আর গরম গরম ভাত, মেঝেতে পাত পেরে খাবার মজাই আলাদা।
রাতের খাবার পর, হোটেলে ফিরে শুরু হলো কষ্টের সময়। ইলেকটিক আসছে আর যাচ্ছে, সারা রাত প্রায় না ঘুমিয়ে, ঘামে ভিজে ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষায় রইলাম। আমার একার জন্য হোটেল জেনারেটর চলবে না , আর চালাবে কে, পুরো হোটেলে আমি ছাড়া আর তো কোন মানুষ নাই। ভোর ৪টের সময় ঘর থেকে বেরিয়ে , ক্যামেরা আর দূরবীন নিয়ে আবার চলে গেলাম নদীর ধারে বেঁধে রাখা বোটের। এইবার একটা নতুন সমস্যা, ভাঁটার সময় জল নেবে বোট উঠা মুশকিল। অনেক টা ঝুলে, লাফিয়ে, পায়ে কাদা লাগিয়ে বোট এ উঠলাম ঘুম চোখে। উপরের ডেক এ ঠাণ্ডা হাওয়া ঘুম আসতে বেশি সময় লাগলো না।
ঘুম ভাঙ্গলো পাখির কিচির মিচির শব্দে। তখন প্রায় সকাল ৭টা। একটু পাখি দেখা, ছবি তোলা, রাজুর সাথে গল্প, আর সুন্দরবনের অপরিসীম সৌন্দর্য্য বেশ কিছুটা সময় চলে গেল। এইবার ফেরার পালা।
সকালের জলখাবার পেলাম ভিম দার বাড়িতে। হোটেল রুম এ এসে আর একবার স্নান সেরে নিলাম। দুর্গা টুনটুনি আর দোয়েল পাখিরা আমার সাথে দেখা করতে এসে গেছে তার মধ্যে।
ভিম দা কে অনুরোধ করে সুন্দরবনের মধু নিলাম সাথে। একদম টাটকা মধু, সুন্দরবনের ভিতর থেকে আনা হয়েছে এই দিন কয়েক আগে।
সকাল 10 টায় আবার। রাজুর মোটরসাইকেল চেপে ফেরার পথে পাড়ি দিলাম। প্রচণ্ড গ্রীষ্মের তাপে। মোটরসাইকেল চেপে, দুইবার ফেরী বোট আর একবার টোটো চেপে পৌঁছে গেলাম আবার গদখালী। নিজের মোটরসাইকেল চেপে কলকাতা পৌঁছাতে পৌঁছাতে সূর্য দেব পশ্চিম প্রান্তে ডুব দিয়েছে।
আর একটা সুন্দরবনের স্মৃতি নিয়ে ফিরে এলাম পাহাড়ে। লিখে ফেললাম আমার দাঁড়াগাঁও কালিম্পং এর ঘরে বসে ২জুন ২০২৫।






