ঘটনার শুরু ২১ জুলাই ২০২৩ সকাল বেলা । মহেশতলা – বাটানগর
আজ যে ঘটনা টা লিখতে যাচ্ছি সেটা বেশ কিচ্ছু দিন আগেকার। প্রায় দুই বছর আগে জুলাই ২০২৩ এর ঘটনা, একটু পটভূমিকা না করে নিলে মনে হয়ে এই ঘটনার বিবরণ টা ঠিক দেওয়া যাবে না। তাই শুরু করলাম নিজের কথা লিখে ।
প্রায় ২২ বছর একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করে, মনের খামখেয়ালিতে চাকরি ছেড়ে জুলাই ২০২৩ এর প্রথম থেকে বাড়িতে বসে আছি। কি করবো, কিছু জানি না। অনেক দিন থেকে মনের ইচ্ছা ছিল চাকরিটা আর করবো না। কিন্তু অবসরের জীবন যাপন করবো , বিশ্রাম নেবো সেই ইচ্ছা একটুও ছিল না। নতুন ভাবে কিছু করবো, নতুন কোনো কাজ সেই ইচ্ছাতে চাকরি ছাড়া। কিন্তু নতুন কাজ টা কি , কোথা থেকে শুরু করবো সেটা বুঝে উঠেতে পারছিলাম না। বিভিন্ন মানুষ কে ফোন করে কথা বলছিলাম। চেষ্টা করছিলাম একটু গুছিয়ে নিয়ে শুরু করার । সেই রকম একটা দিনে ফোন ঘটতে ঘটতে হঠাৎ সমীর দা কে ফোন করি।
সমীর সাহা – আমার পুরানো পরিচিত এক মানুষ, যে বিভিন্ন রকম কাজের সাথে যুক্ত । সুন্দরবনে বেড়াতে যাবার আমার প্রধান পথ প্রদর্শক । পাখি ও বন্য জন্তু দেখা, চেনা আর ভালোবাসা এই সমীর দার হাত ধরে। চাকরি পরবর্তী জীবনে যে টুর ট্রাভেল এর পেশায় এসেছি সেটাও দাদার দেখানো আর উৎসাহে। এই দিনটি জীবনের যেমন একটা বিশেষ দিন , সেই রকম সমীর দা কে ফোন করা আর কথা হওয়া টাও একটা বিশেষ ঘটনা।
দিন টি খুব ভালো করে মনে আছে – ২১ জুলাই ২০২৩, সকাল ৯ টার একটু আগেই সমীর দা কে ফোন করেছিলাম। সমীর দা জানালো সে এই মাত্র তার বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে একটা কাজে বান্ডেল যাচ্ছে। কাজটি কি জিজ্ঞেস করতে, উত্তর পেলাম , জানতে চাও তো সকাল ১০:৩৫ এর বান্ডেল লোকাল ট্রেন এ শেয়ালদা স্টেশনে দেখ করো. – দু তিন দিনের পোশাক নিয়ে এসো সাথে। সাত পাঁচ না ভেবে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে প্রস্তুত করে একটা ব্যাক প্যাক এ নিজের পার্সোনাল জিনিস নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বজ বজ – শেয়ালদা লোকাল ট্রেন ধরার জন্য । মনের ভিতরে একটা উত্তেজনা , মনে হল একটা এডভেঞ্চার এর গন্ধ পাচ্ছি ।
সময় মত শেয়ালদা স্টেশন পৌঁছে গেলাম। বান্ডেল লোকাল খুঁজে সমীর দার সাথে দেখাও হয়ে গেল। সমীর দার সাথে দেখা পেলাম লালু দা , দিনু দা ( দীনবন্ধু ), আর এক ভাই গনেশ এর সাথে। ট্রেন চলতে শুরু করলে নিজের উৎসুকতা চেপে রাখতে পারলাম না. মিশন টা কি? সংক্ষিপ্ত ভাবে যেটা জানতে পারলাম সেটা এই রকম – ব্যান্ডেল চার্চ এর কাছে রাখা একটা মোটর বোট কে সুন্দরবন নিয়ে যেতে হবে. কাজটা আমাদের করতে হবে। সাথে যারা যাচ্ছে তারা সুন্দরবনে বোট চালানোর অভিজ্ঞ। মিশন টা বেশ ইন্টারেষ্টিং। আমার এই লেখার বিষয় টাও এই বোট টাকে কি করে ব্যান্ডেল চার্চ থেকে সুন্দরবন নিয়ে যাওয়া হলো তার বিবরণ ।
দুপুরের আগে পৌঁছে গেলাম ব্যান্ডেল স্টেশন । স্টেশন চত্বরের সবাই দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম । উঠে পড়লাম একটা টোটো রিক্সাতে চার্চের উদ্দ্যেশে। ব্যান্ডেল চার্চের দেওয়ালের পাশে রাস্তা ধরে হেঁটে পৌঁছে গেলাম গঙ্গা (হুগলি ) নদীর ধারে । জোয়ারের জলে নোঙ্গর করে বসে আছে বিশাল বোট MV New Usha. নদীর থেকে একটা নালা চার্চের পাশের মাঠে ঢুকেছে, সেই নালাতে বাঁধা বোট টি। অনেক ডাকা ডাকি করে বোট থেকে বেরোল ষাট উদ্ধ বয়েসের মানুষ – শক্ত পোক্ত গড়ন , জানতে পারলাম সেই এই বোটে থাকে। প্রায় ৩ মাস হলো বোট টি এই ঘাটে এই রকম ভাবে বাঁধা আছে। আগে হুগলি পুলিশের দপ্তরে কাজে লিজ দেওয়া ছিল ৩ মাস লিজ শেষ হয়ে এইখানে রাখা । বোট এর সাথে এই ৬০ বছরের বুড়ো মাঝি পরান কাকা ও বোট এ বন্দি। পরান কাকার বাড়ি – পারিবার থাকে গদখালী এর আগে মসজিদ বাড়ি গ্রামে। প্রায় ৬ মাস হলো সে বাড়ি যায়নি।
সুন্দরবন যাতায়াতের সূত্রে বেশ কিছু জিনিস আমিও শিখে ছিলাম – Motor Boat (MB) আর Motor Vessel (MV) এর গঠন মূলক ব্যবধান জানতাম । – Motor Boat বা MB ও Motor Vessel বা MV এর প্রধান তফাৎ তাদের খোলের জন্য । Boat এর সামনে পেছনে দিক নৌকার মত গোল আকৃতি , অনেক টা মোচার খোসার আকৃতি । আর Vessel এর সামনেটা ছুঁচালো ও উঁচু। Vessel এর পিছনের দিক টা সমান, যেন হটাৎ শেষ হয়ে গেছে। এক কোথায় Vessel বড়ো জাহাজের ছোট সংস্করণ আর মোটর বোট ছোট নৌকার বড় সংস্করণ। উভয় বাহনের চালানোর নিয়ম প্রায় এক রকম. উপরের ডেকে একটা পাইলট কেবিন থাকে। পাইলট বা সারেঙ বসে wheel এ। সে বোট চলার দিক নিয়ন্ত্রন করে। পুরাতন বোট এ আরও একজন কর্মচারী লাগে যাকে ইঞ্জিন ম্যান বলে। সে সারেঙ এর নির্দেশে ( ঘন্টার আওয়াজে ) ইঞ্জিন চালায় , সামনে , পিছনে দিকে বোট কে নিয়ে যায়। ইঞ্জিন ম্যান প্রায় বাইরের কি আছে জানতে পারে না। সে পাইলট এর ঘন্টার আওয়াজে এর মানে বুঝে বোট এর ইঞ্জিন দিয়ে প্রপেলার ঘোরায়।






উপরের বোট সম্বন্ধে এতটা লেখার একটাই কারণ, আমাদের মিশন যে জল যান টাকে ব্যান্ডেল থেকে সুন্দরবনে পাড়ি দেবো তার একটা বিবরণ দেবার দরকার। MV সব সময় MB থেকে বড় হয়ে . ইঞ্জিন ও MV তে বড় থাকে। গতি ও বহন ক্ষমতা ও বেশি থাকে। আমাদের MV New Usha লম্বায় প্রায় ৬০ ফুট, পেটের কাছে চড়াতে ২০ ফুট। জোয়ারের জল টপকে এক এক করে উঠে পড়লাম New Usha বোট এ। বোট টি বেশ পুরানো কিন্তু শক্ত পোক্ত। যেহেতু পুলিশের কাজে ব্যবহার হতো , তাই মাইনটেন্সন ভালো হতো। বোট এ উঠে যা যার কাজ বুঝে নিল। গনেশ ভাই পাইলট কেবিন এ – দিনু দা ইঞ্জিন ম্যান – লালু দা রান্না ঘর সামলাবে, সমীর দা ওভার অল ম্যানেজার আর financer . আমি এক মাত্র যাত্রী এবং ফটোগ্রাফার ।
পরান কাকা এতদিন পরে মানুষ জন দেখে খুব খুশি, ৩ মাস পরে বোট টা আবার চালু হবে সেটা তার কাছে আর একটা সুখবর। কিন্তু Kirloskar এর ৬ সিলিন্ডার ইঞ্জিন ৩ মাস পরে স্টার্ট করতে প্রাথমিক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে লাগলো প্রায় ১৫ মিনিট । – বোটের ইঞ্জিন স্টার্ট হলো। এই বার পরবর্তী চ্যালেঞ্জ পানা ভর্তি সরু খাল থেকে এতো বড় বোট কে বের করে হুগলী নদীতে আনা। সেখানেও পরান কাকার পারদর্শিতা দেখলাম । জলে নেবে পানা সরিয়ে উঁচু ডাঙায়, গাছে বাঁধা দড়ি খুলে বোট টি কে মুক্ত করে ধীরে ধীরে নদীর জলে মিশিয়ে দিল – পরান কাকা । বোট এ যা তেল আছে তাতে খুব বেশি দূর যেতে পারবে না। আমাদের নদী পথে যাত্রা শুরু হল MV New Usha তে, প্রথম গন্তব্য চন্দননগর ফেরি ঘাট – তেল আর খাবার জল নেবার জন্য । চলা শুরু হলো দক্ষিণ মুখে তখন বেলা ৩:১ ৫ বাজে ।
নদী পথে যাবার ইচ্ছা তো সবার থাকে , কিন্তু হঠাৎ করে আমার এই ইচ্ছাটা যে সত্য ঘটনা হয়ে যাবে, সেটা নিজের বিশ্বাস হচ্ছিল না। হঠাৎ যে সুযোগ এসে গেল, আর বিকালের মধ্যে আমি একটা বড় বোট এ করে কলকাতার উত্তরে হুগলী জেলার সদর থেকে সুন্দরবনের পথে পাড়ি দিয়েছি – এ এক অদ্ভুত অনুভূতি। মনের ভিতর একটা এডভেঞ্চার উত্তেজনা, না জানি কত কি দেখবো।
বোট চলছে দক্ষিণ মুখে । পরান কাকা কে নিয়ে বোটে আমরা ৬ জন মানুষ। ব্যান্ডেল চার্চ কে চোখের থেকে দূরে যেতে না যেতে দেখা পেলাম হুগলী ইমামবাড়া। জুবলী ব্রিজের নিচে দিয়ে নদীর ডান দিক ঘেঁষে চলতে চলতে পৌঁছে গেলাম চন্দননগর ফেরি ঘাট। দরকার মত জল ও তেল নেওয়া হল বোটে। মিনিট ৩০ থামার পর বোট চললো বারাকপুর টিটাগড়ের দিকে । আজকের রাত্রিবাস বোটে হবে। কিন্তু আগামী লম্বা যাত্রা পথের জন্য তেল, সেটি টিটাগড়ের পাম্প থেকে নিতে হবে। একটা আশ্চর্য সূর্য আস্ত দেখতে দেখতে টিটাগড়ের রানী রাসমণি ঘাটের পাশে পুলিশ জেটি তে বোট লাগলো রাতের জন্য । এইবার শুরু হলো বাজার হাটের পালা ।
বোটের তেল , আমাদের খাবার ,রসদ , রান্নার উনুন, চাল, ডাল, রান্নার তেল, মুড়ি , নুন , সব কিছুর লিস্ট করে এক এক জন বেরিয়ে পড়লো এক এক দিকে । পরান কাকা থাকলো বোট এর দায়িত্বে। টিটাগড়ের ওয়াগন ফ্যাক্টরি পাশে বেশ বড় বাজার, দরকার মোট সব জিনিস পত্র জোগাড় করে এক এক জন ফিরলাম জেটি ঘাটে। রাতে রান্না হল ভাত ডাল, আর ডিমের ঝোল। হুগলী নদীর তিরতিরে বাতাসে রাতের খাবার বোটে খেয়ে, সবাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। ঠিক হলো আগামী কাল ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে বোট ছাড়বে দক্ষিণ মুখে।
লেখাটি তিন দিনের যাত্রার বিবরণ তাই , একটু লম্বা হবে। আমাদের এই চলার পথে কি কি ঘটেছিল, সেইগুলি জানার জন্য চোখ রাখুন আমার এই প্রোফাইলে।
